নির্মল রায়:
শীতের সকালের নরম রোদে তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলো এখন সবুজে ভরে উঠেছে। একসময় যেখানে ছিল শুধু বালু, ধুলা আর অনিশ্চয়তা, সেখানে আজ কৃষকের ঘামে জন্ম নিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা চরাঞ্চল এখন জীবনসংগ্রাম আর স্বপ্ন ফেরার গল্প শোনাচ্ছে।
বর্ষা মৌসুম শেষে তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেই ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে বিস্তীর্ণ চর। প্রথমদিকে এসব চর শুধু বালুময় প্রান্তর মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে শুরু হয় মানুষের পদচারণা। স্থানীয় কৃষকেরা বাঁশের লাঠি হাতে জমি মাপেন, বালুর ওপর টেনে নেন নতুন জীবনের রেখা। এরপর শুরু হয় চাষাবাদ।
বর্তমানে চরজুড়ে দেখা যাচ্ছে ভুট্টার হলুদাভ শিষ, সবুজ মরিচ গাছ, কুমড়ার লতানো ডগা ও বিভিন্ন জাতের শাকসবজি। কোথাও বাদাম, কোথাও আউশ ধানের চারা। উর্বর বালুমাটি ও খোলা পরিবেশে এসব ফসল দ্রুত বেড়ে উঠছে।
শংকরদহ চরের কৃষক রহিম মিয়া বলেন,
নদীভাঙনে একসময় সব হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন এই চরে চাষ করে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। ফসল বিক্রি করে সংসার চলছে, ছেলেমেয়ের পড়াশোনাও চালাতে পারছি।
তবে এই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ঝুঁকি। চরাঞ্চল স্থায়ী নয়। উজান থেকে নেমে আসা হঠাৎ ঢল কিংবা অকাল বন্যায় এক রাতেই তলিয়ে যেতে পারে মাসের পর মাসের পরিশ্রম। তাই চাষাবাদের পাশাপাশি কৃষকদের মনে কাজ করে অনিশ্চয়তার শঙ্কা। তবুও জীবন থেমে থাকে না—ঝুঁকি নিয়েই তারা এগিয়ে চলেছে।
চর কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। ফসল তোলা, শাকসবজি পরিচর্যা থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন তারা। এতে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি নারীদের সামাজিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত সেচব্যবস্থা, নদীশাসন ও বাঁধ সংস্কার করা গেলে তিস্তার চরাঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সহজ শর্তে ঋণ ও কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা।
তিস্তার জেগে ওঠা চর শুধু বালুর স্তূপ নয়, এটি মানুষের লড়াই, ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি ও আশার প্রতিচ্ছবি। সবুজে মোড়া এই চরগুলো প্রমাণ করছে, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেও মানুষ স্বপ্ন বুনতে জানে।