নীলফামারীতে হঠাৎ ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বিপর্যস্ত উত্তরের কৃষি খাত

2026-03-29 02:28:15

হাবিবুল হাসান হাবিব, ডিমলা (নীললফামারী):

উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায়  হঠাৎ ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কৃষি খাতে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত  টানা ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে নীলফামারী জেলার ডিমলা, জলঢাকা, ডোমারসহ আশপাশের উপজেলাগুলোর মাঠের ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা, যারা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন।

সরে জমিনে দেখা যায়, শুক্রবার দিবাগত রাতের শেষ ভাগে হঠাৎ দমকা হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় শিলাবৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যে কৃষিজমির সবুজ মাঠ যেন ধূসর রূপ নেয়। কৃষকের আবাদী জমির ভুট্টার ক্ষেতের গাছগুলো মাটিতে নুয়ে পড়ে, ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে আগামী মৌসুমের ফলন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। একই সঙ্গে ধান,মরিচ, বেগুন সহ অন্যান্য শাকসবজির ক্ষেত ব্যাপকভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। উপজেলার দশটি ইউনিয়নের অনেক এলাকায় বিশেষ করে ভুট্টার ক্ষেতগুলো মাটিতে পড়ে আছে, আবার কোথাও গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৯ মার্চ রাত ২:৩০ মিনিট সময়ে ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি ,খালিশা চাপানি,ঝুনাগাছ চাপানি,টেপা খড়িবাড়ি ও নাউতারা ইউনিয়নের বিভিন্ন যায়গায় শিলা বৃষ্টি ও আকষ্মিক ঝড়ো বাতাসে ভূট্টা, মরিচ, পেয়াজ, সবজি ও তরমুজ সহ বিভিন্ন ফসল মোট ৪৪ হেক্টর জমি আক্রান্ত  হয়। হঠাৎ কয়েকদিনের ব্যবধানে দুই দুইবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে ।

কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় তারা উচ্চ মুল্যে বীজ, সার সংগ্রহ করে জমিতে শ্রম বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন। অনেকেই ব্যাংক ও স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ শুরু করেছিলেন।  এখন তারা ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।  উপজেলার কাকিনা চাপানী গ্রামের বিলকিস বেগম  কাঁদতে কাঁদতে বলেন, এক রাতেই আমাদের ভুট্টা গাছগুলো শেষ হয়ে গেল, এখন আমরা কীভাবে দাঁড়াব বুঝতে পারছি না। সুন্দর খাতা গ্রামের কৃষক মাছুম ইসলাম জানান, অন্যের জমি বর্গা  নিয়ে এনজিও থেকে ঋণ করে দুই বিঘা জমি ভুট্টা লাগিয়েছি, গাছগুলোতে ভুট্টার মোচা শুধু বের হয়েছে দানা আসতে না আসতেই গত রাতে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে সব শেষ, আমার মত এ এলাকার অনেক কৃষক আজ সর্বশান্ত।

 এদিকে কৃষি বিভাগ  জানান, ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণের জন্য কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের জরিপ চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ২৮ মার্চ ২০২৬ ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আকষ্মিক ঝড়ো বাতাস ও শিলা বৃষ্টিতে আনুমানিক ৭৫ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ডিমলা উপজেলায় ভূট্টা ৫০ হেক্টর, গম ১০ হেক্টর,মরিচ  ১২ হেক্টর, শাকসবজি ৩ হেক্টর সহ অন্যান্য ফসলের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তীতে ক্ষয়ক্ষতির চুড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান করা হবে।  তবে পুরো রিপোর্ট পেলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন এবং তথ্য সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি কৃষকদের পুনরায় চাষাবাদে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা ও বীজ সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না ।

অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ের সাধারণ কৃষকরা দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সময়মতো সহায়তা না পেলে অনেক কৃষক চরম আর্থিক সংকটে পড়বেন এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে যারা ঋণের ওপর নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এ ধরনের আকস্মিক ঝড় ও শিলাবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। ফলে কৃষি খাতে ঝুঁকিও বাড়ছে। তিনি বলেন, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সব মিলিয়ে, হঠাৎ ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে উত্তরের কৃষি খাত এক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। এখন কৃষকেরা তাকিয়ে আছেন সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের দিকে, যা তাদের আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।