ইউএনও এবং বিএনপি নেতার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

2026-04-22 05:37:37

যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর আলম ও ইজারাদার আব্দুল মতিন
পীরগাছার দেউতিহাট হাট ইজারা ঘিরে হরিলুট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘দেউতি হাট’ ইজারা নিয়ে পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার নাম ভাঙিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। খাস ডাকের আড়ালে ইজারাদারের এই ‘নয়-ছয়’ এবং বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

হাট সূত্রে জানাযায়, গত ৯ এপ্রিল পীরগাছা ইউএনও কার্যালয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের উপস্থিতিতে ২০ জন  বিডার (ইরফফবৎ) অংশগ্রহণে দেউতি হাটের খাস ডাক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলমের মধ্যস্থতায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকায় হাটের ইজারা পান পারুল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন।

হাট পাওয়ার পরপরই ইজারাদার আব্দুল মতিন ও যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর আলম বিনিয়োগকারী অন্তত দেড়শো জনকে জানান যে, হাট পেতে বড় অঙ্কের ‘ঘুষ’ দিতে হয়েছে। তারা হিসাব প্রদান করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক-৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা- ২ লাখ টাকা। পারুল ইউনিয়ন ভূমি তহশিলদার-২০ হাজার টাকা। ছাগলের হাটের মাঠ ভাড়া -১ লাখ (অতিরিক্ত ৫০ হাজার) হাজার টাকা। অন্যান্য ও ব্যাংক খরচ-২৩,৬০০ টাকা।

হাটে বিনিয়োগকারী বিএনপি নেতা তাজুল ইসলাম, আরিফ ইফতেখার রাজু, সাহেব আলী, আফজাল মেম্বার ও ইসমাইল হোসেনসহ অন্তত ৫০ জন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, সরকারি খাস ডাকের বাইরে এই ৬ লাখ ১৩ হাজার ৬শ টাকার অতিরিক্ত হিসাব সম্পূর্ণ অবৈধ ও চাঁদাবাজির শামিল। তারা বলেন মতিন ও জাহাঙ্গীর যোগসাজশে এই কাজ তারা গত বছরেও করেছে।  তারা আরও বলেন, এদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে এই এলাকায় বিএনপির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।

অনুসন্ধানে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।দেউতি বাজারের অসংখ্য ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন,গত ১৪৩২ বাংলা সনে তাহারত উল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর এই হাটের টেন্ডার ড্রপ করেছিলো প্রায় ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু তৎকালীন ইউএনও নাজমুল হক সুমন (বর্তমানে ঠাকুরগাঁও এর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), উপজেলা বিএনপি সভাপতি  আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা, উপজেলা  যুবদলের আহবায়ক জাহাঙ্গীর ও পারুল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন যোগসাজশ করে, সেই টেন্ডার বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে মাত্র ২৫ লাখ টাকায় খাস ডাক নিয়ে সেটিকে ৩৬ লাখ টাকা খরচ দেখিয়ে হাট কালেকশন করেন। তখন সরকারি কোষাগারে নামমাত্র টাকা জমা দিয়ে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব আত্মসাৎ করা হয়।

সরকারি আইন লঙ্ঘন করে এই হাটটি পুনরায় সাব-ইজারা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাব-ইজারাদার বেলাল হোসেন জানান, ১৩ এপ্রিল রাত দশটার দিকে হাট অফিসের এক বৈঠকে মতিন ও জাহাঙ্গীর খাস ডাক-১৮ লাখ ৮০ হাজারের স্থলে সারে ২৩ লাখ টাকা দেখান। এছাড়াও হাটের সাব-ডাক আহ্বান করেন। সেখানে কাপড় ব্যবসায়ী নুর নবী, দেউতি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল কাদেরকে টপকে ৪৫ লাখ টাকায় হাটটি আমি পাই। সেখানে সকল বিনিয়োগকারীদের সামনে মতিন ও জাহাঙ্গীর  ইউএনও, রাঙ্গা,তহশিলদার সহ অন্যান্য টাকার হিসাব দেন।

এ বিষয়ে ইজারাদার আব্দুল মতিন দম্ভোক্তি করে বলেন, “আমি কাকে কত দিয়েছি সেটা আমার বিষয়। আমি তো কোনো অভিযোগ করিনি।” অন্যদিকে যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এটা আমাদের দলীয় বিষয়, আমরা নিজেরা বুঝে নেব। আপনি পরে আমার সাথে দেখা করেন।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও তার দলের নেতাদের করা অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি। তবে ইউএনও দেবাশীষ বসাক বলেন, “আমার নামে মিথ্যা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে। আমি ইজারাদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। দণ্ডবিধি ১৬১ ও ৪২০ ধারামতে সরকারি কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায় করা প্রতারণা ও দণ্ডনীয় অপরাধ। হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩: সরকারি হাট সাব-ইজারা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমন প্রমাণ মিললে ইজারা বাতিলসহ ইজারাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে বলা আছে পরিকল্পিতভাবে সরকারি রাজস্ব ক্ষতি করা সরাসরি দুদকের আওতাভুক্ত অপরাধ। (গত বছরের ৩৬ লাখ ও এ বছরের অনিয়ম)

এলাকাবাসীর দাবি, যারা প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে এই লুটপাট চালাচ্ছে, তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং রাষ্ট্রের হারানো রাজস্ব উদ্ধার করা হোক।