কুড়িগ্রাম থেকে খুলনা-সাতক্ষীরা: নারী নেতৃত্বে বাধ সুরক্ষায় ও দুর্যোগ সহনশীলতায় ৯০০ পরিবারের পাশে নতুন উদ্যোগ

2026-04-23 03:28:47

আহসান হাবীব নীলু,  কুড়িগ্রাম:

কুড়িগ্রামের ধরলা নদী তীরবর্তী ওয়াপদা বাঁধ সংলগ্ন ভাঙনকবলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিবারগুলোকে দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে আরও প্রস্তুত, সক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তুলতে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী নেতৃত্বাধীন পরিবারগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, বাঁধ সুরক্ষায় কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবার সাথে কার্যকর সংযোগ তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এসোসিয়েশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট (এএফএডি) লিড পার্টনার হিসেবে এবং ইউএন ওমেন’র আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত “জেন্ডার রেসপন্সসিভ ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ” প্রকল্পের আওতায় বুধবার সকালে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রামের পাশাপাশি উপকূলীয় জেলা খুলনা ও সাতক্ষীরার ঝুঁকিপূর্ণ বাধ এলাকাতেও কার্যক্রম পরিচালিত হবে। খুলনায় ASDDW এবং সাতক্ষীরায় Bindu Nari Unnayan Sangathan বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্যও একইভাবে দুর্যোগ প্রস্তুতি, জীবিকা উন্নয়ন এবং নারী নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি. এম কুদরত-এ-খুদা, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান এবং কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি সফি খান। অনুষ্ঠানে বাঁধ সুরক্ষায় একটি গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি. এম কুদরত-এ-খুদা তার বক্তব্যে বলেন, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে নারীরা তাদের মতামত ও সমস্যাগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে তুলে ধরেছেন, যা নারী ক্ষমতায়নের একটি স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য তিনি এএফএডি’কে ধন্যবাদ জানান।

এএফএডি’র নির্বাহী প্রধান সাইদা ইয়াসমিন জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিন জেলায় মোট ৯০০ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে দুর্যোগ প্রস্তুতি, বিকল্প আয়ের সুযোগ এবং স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক সরকারি সেবার সাথে সংযুক্ত করা হবে। পাশাপাশি বাধ সুরক্ষা (EPG) গ্রুপের মাধ্যমে নারী নেতৃত্বকে বিকশিত করে বাঁধ সুরক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং কমিউনিটি পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।

মনিটরিং ও ইভালুয়েশন অফিসার অমর দাস তার বক্তব্যে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে মনিটরিং ও ইভালুয়েশন প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “আমরা বাঁধ সুরক্ষায় নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত করছি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে বাঁধ সুরক্ষায় ব্যবহৃত জিও ব্যাগ মানুষ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছে। সরকারি এই সম্পদ রক্ষায় এবং জিও ব্যাগের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি।”

প্রকল্প  ব্যবস্থাপক মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং সেবা সংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় বাঁধ সুরক্ষা কমিটি এবং ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে যাতে স্থানীয় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী জরুরি সাড়া প্রদান নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে বাঁধ রক্ষা ও জরুরি মেরামতের ক্ষেত্রে ইপিজি সদস্যদের অভিজ্ঞতাকে সরকারি ডিআরআর (DRR) পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা ও নারী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় মালিকানা ও নারী নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।

সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী এবং স্থানীয় অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সভাটি সঞ্চালন করেন রোজিনা আক্তার, প্রোগ্রাম ফোকাল, এএফএডি।