ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা শিব মন্দির: সংরক্ষণ, সংস্কার এবং ঐতিহ্য রক্ষার দাবী

2026-04-25 18:40:43

প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট(কুড়িগ্রাম):  

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে দিঘির উপরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শিব মন্দিরটি আজ ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে। এক সময়ের জাকজমকপূর্ণ পূজা-অর্চনা, ঢাক-ঢোলের শব্দ আর ভক্তদের পদচারণায় মুখর এই মন্দিরটি এখন নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। অবহেলা আর অযত্নে হারিয়ে যেতে বসেছে ঘড়িয়ালডাঙ্গা জমিদারবাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী শিব মন্দির। সময় থাকতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে হয়তো একদিন এই মন্দিরের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।  তাই এখনই প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগে মন্দিরটি সংরক্ষণ, সংস্কার এবং ঐতিহ্য রক্ষার দাবী করেছেন স্থানীয়রা। 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘড়িয়ালডাঙ্গা জমিদারবাড়ির একমাত্র ধর্মীয় উপাসনালয় ছিল এই শিব মন্দির। জমিদার পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হতো। বিশেষ করে শিবরাত্রি, দোলযাত্রা বা অন্যান্য হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে উঠত উৎসবমুখর। ঢাক-ঢোল, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের সমাগমে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। দূর-দূরান্ত থেকেও ভক্তরা এখানে আসতেন পূজা দিতে।

ওই এলাকার আব্দুর রাজ্জাক দুলাল(৭০) জানান, আমার দাদা ঘড়িয়ালডাঙা জমিদার বাড়ির পেয়াদা ছিলেন। তার কাছ থেকে শুনেছি, ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়ে অন্নপূর্ণা দেবী ছিলেন ঘড়িয়ালডাঙ্গা জমিদারবাড়ির শেষ জমিদার। তার শাসনামলে এলাকায় হঠাৎ করেই বসন্ত রোগের (গুটি বসন্ত) ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। একের পর এক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করতে থাকেন। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জমিদার পরিবারও। জীবন বাঁচাতে এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অন্নপূর্ণা দেবী তার পরিবার-পরিজনসহ জমিদারবাড়ি ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। সেই যাত্রা আর ফেরার যাত্রা হয়নি।

জমিদার পরিবারের প্রস্থানেই যেন থেমে যায় মন্দিরের প্রাণচাঞ্চল্য। পূজা-অর্চনা বন্ধ হয়ে যায়, মন্দির পড়ে থাকে অযত্ন আর অবহেলায়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ধীরে ধীরে মন্দিরের গঠন দুর্বল হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে ফাটল ধরে, ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ে এবং চারপাশের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।

জমিদার বংশের কেউ আর এলাকায় ফিরে না আসায় তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের অধীনে চলে যায়। তবে যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক সম্পত্তি বেদখল হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। অবশিষ্ট কিছু সম্পত্তি এখনো সরকারের খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলী ছিল অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। সুচারু কারুকাজ আর স্বল্পীল শিল্পকর্মের মাধ্যমে নির্মিত এই মন্দিরে চারদিকে দরজা ছিল, যা সে সময়ের নির্মাণশৈলীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে ছিল শিবলিঙ্গ, যেখানে ভক্তরা নিয়মিত পূজা দিতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকার কারণে সেই শিবলিঙ্গটিও চুরি হয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা অনিল চন্দ্র রায়(৭৫) বলেন, প্রায় এক যুগ আগে দেশে ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে সীমান্ত পিলার ও পুরোনো স্থাপত্য উপকরণ চুরির ঘটনা বেড়ে যায়। সেই সময়ই দুর্বৃত্তরা এই শিব মন্দিরের চূড়ার মূল্যবান টবসহ একটি ত্রিশুল চুরি করে নিয়ে যায়। এরপর থেকে মন্দিরের চূড়াটি ফাঁকা পড়ে আছে, যা মন্দিরটির সৌন্দর্য আরও ম্লান করে দিয়েছে।

বর্তমানে মন্দিরটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিবেশ, ভেঙে পড়া দেয়াল এবং নীরবতা যেন অতীতের ইতিহাসকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলছে। স্থানীয় অনেকেই এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে ওই এলাকার  আজিজুল হক, একরামূল হকসহ বেশ কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি বলেন, ঘড়িয়াডাঙ্গা শিব মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এর সংস্কার ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও বলেন, মন্দিরটি পুনঃসংস্কার করা হলে শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় স্থনে হিসেবে পরিণত হতে পারে।

রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল ইমরান বলেন, “ঘড়িয়ালডাঙ্গা জমিদারবাড়ির প্রায় দুই শত বছর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শিব মন্দিরটির বর্তমান ভগ্নদশা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং আমাদের অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি আরও বলেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে মন্দিরটির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বিশেষ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কীভাবে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি সংরক্ষণ ও সংস্কার করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।#