শ্যামপুর চিনিকলের 'মৃত্যু-পরোয়ানা' কার হাতে?

2026-04-29 22:31:44

নিজস্ব প্রতিবেদক:

"মেশিনগুলো যখন চলত, মনে হতো এলাকার হৃদপিণ্ডটা স্পন্দিত হচ্ছে। এখন সব নিঝুম। এই নিস্তব্ধতা আমাদের গিলে খাচ্ছে বাবা।"ফজলুল হক, প্রান্তিক কৃষক।

একটি বিশাল শিল্পপ্রতিষ্ঠান কি কেবল লোকসানে মরে যায়, নাকি তাকে সুনিপুণ আমলাতান্ত্রিক কৌশলে 'হত্যা' করা হয়? রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিলের ১১১ একর জমির ওপর তাকালে মনে হয়, এটি কোনো কলকারখানা নয়, বরং উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির এক বিশাল গণকবর। যেখানে মরিচা ধরা প্রতিটি নাট-বল্টু আজ রাষ্ট্রের নৈতিকতার দিকে আঙুল তুলছে।

বদরগঞ্জের শ্যামপুর বন্দরে পা রাখলে থমকে যেতে হয়। এক সময়ের প্রাণচঞ্চল এই বন্দরে এখন কেবলই ধুলো আর দীর্ঘশ্বাস। এক সময় আখের ভারে নুয়ে পড়া ট্রলিগুলোর যে জটলা থাকত, সেখানে এখন শিয়াল ডাকে। মিলের সহকারী ব্যবস্থাপক (ভান্ডার) দেবাশীষ সিংহ রায়ের দেওয়া তথ্য এক বীভৎস বৈপরীত্যের পর্দা উন্মোচন করে। মিল বন্ধ, উৎপাদন শূন্য; অথচ প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।

বছরে প্রায় তিন কোটি টাকা খরচ করে রাষ্ট্র আসলে কী উৎপাদন করছে? উত্তরটি সহজ-একটি প্রাচীন দানবের কঙ্কাল পাহারা দেওয়া। মিলের ভেতর এখন ২৯ জন স্থায়ী আর ৩৪ জন অস্থায়ী কর্মীর এক 'ভুতুড়ে' সংসার। এই অপচয় কি 'লোকসান' কমানোর অংশ, নাকি দুর্নীতির চাকা সচল রাখার মরণকামড়? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর দাপ্তরিক দ্বৈরথ। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর টাস্কফোর্সের সুপারিশে যখন মাড়াই স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হলো, তখন কৃষকের মনে আশার প্রদীপ জ্বলেছিল। শিল্প মন্ত্রণালয় শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকার একটি জীবনদায়ী তহবিল চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু গত ৩০ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আসা চিঠির ভাষা ছিল চূড়ান্ত এবং নির্মম। বিগত দুই দশকের 'পরিচালন ঋণ'-এর অজুহাত দিয়ে তারা অর্থ বরাদ্দ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রবাদ আছে, 'মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা'। অর্থ বিভাগ লোকসান হ্রাসের দোহাই দিয়ে যে মিলটি বন্ধ রেখেছে, সেই মিলটি সচল করতে প্রয়োজনীয় অর্থের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ তারা প্রতি বছর ভর্তুকি আর পাহারার বেতনে গচ্চা দিচ্ছে। তবে কি এই 'লোকসান' আসলে একটি সাজানো নাটক?

চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ানের বয়ানে ফুটে ওঠে এক গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। তিনি বলেন,"শ্যামপুর চিনিকল ছিল এ এলাকার প্রাণের স্পন্দন। এটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে–রাষ্ট্র যখন তার নিজের মিল বন্ধ করে দেয়, তখন বাজারের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে যায়। আমদানিকারক সিন্ডিকেট কি তবে পর্দার আড়ালে বসে এই ফাইলগুলোর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে।আধুনিকায়নের পথে না হেঁটে মিলটিকে কেন 'অচল' হিসেবে চিহ্নিত করা হলো? জয়পুরহাটের জন্য ৩০০ একর জমিতে আখ চাষ হলেও শ্যামপুর কেন ব্রাত্য? এই 'গোপন নেটওয়ার্ক' উন্মোচন করলে দেখা যায়, আমলাতন্ত্রের একগুঁয়েমি আর বাণিজ্যিক স্বার্থের এক অশুভ আঁতাত আজ শ্যামপুরকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছে।

"বেসরকারি অংশীদারত্বের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু তার কোনো হদিস নেই। কাজ হারিয়ে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন,"  বলছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মানিক মিয়া। একজন অর্থনীতিবিদ ঠিকই বলেছিলেন, "উন্নয়ন যদি মানুষের চোখের পানি না মুছতে পারে, তবে তা স্রেফ সংখ্যাতত্ত্বের বিলাসিতা।"  শ্যামপুরের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৫১ কোটি টাকা অনেক বড় মনে হলেও, কয়েক হাজার পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মূল্য তাদের কাছে হয়তো তুচ্ছ।

শ্যামপুর চিনিকল কেবল একটি কারখানা নয়, এটি একটি জনপদের পরিচয়। ২০২৭-২৮ মৌসুমের যে মুলা কৃষকদের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, তা কি আদৌ বাস্তবায়িত হবে? নাকি এটি কেবল মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করার একটি সাময়িক 'অ্যানেস্থেসিয়া'?

মিলের মরচে ধরা কলকব্জাগুলো যেন চিৎকার করে বলছে: "আমরা অচল হইনি, আমাদের অচল করে রাখা হয়েছে।" শুরুর সেই হাহাকার আর শেষের এই শীতল সত্য একই সুতায় গাঁথা। শ্যামপুরের চিমনি দিয়ে যদি আবার ধোঁয়া না ওড়ে, তবে তা হবে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন বিমুখতার এক চূড়ান্ত দলিল।

একটি প্রশ্ন যারা আজ মিলটিকে 'বোঝা' মনে করছে, তারাই কি একদিন এই ধ্বংসাবশেষের ইতিহাস থেকে জবাবদিহিতার মুখে পড়বে না?