২৩ মাঘ, ১৪২৯ - ০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ - 06 February, 2023
amader protidin

ফুলবাড়ীর চার অদম্য মেধাবীর গল্প

আমাদের প্রতিদিন
2 months ago
568


 

আব্দুল আজিজ মজনু, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) থেকে: 

কুড়িগ্রামরে ফুলবাড়ীতে এবছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে হত দরিদ্র পরিবারের ৪ শিক্ষার্থীর সন্ধান পাওয়া গেছে। যাদের একজন হোটেল শ্রমিকের কাজ করে সংসার ও নিজের পড়াশুনা চালিয়েছে, একজন টিউশনি চালিয়ে পড়ালেখাঅ অন্য দু’জন দরিদ্র কৃষকের কন্যা। এই চারজনের নাম শাকিল মিয়া, শিউলী রানী রায়, শিলা রানী রায় ও তাকিয়া আক্তার মনি। দরিদ্র পরিবারের এই চার শিক্ষার্থী এখন উচ্চ শিক্ষায় পড়াশুনা অনিশ্চিত হয়েছে পড়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েও অর্থের অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত নয়।

এক সময় বাবার অনেক সম্পদের মালিক ছিলেন। মনে হতো বাবা ও মায়ের উছিলায় সমাজে উচু হয়ে দাড়িয়ে থাকতে পারা যাবে। কিন্তু নিয়তি পিছু ছাড়ে নি। কষ্ট করে এক কাপড়ে প্রতিদিন বিদ্যালয় যেতে হয়েছে তাকে। বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত ঘেষা তাদের বাড়ী। প্রতিদিন সন্ধার পরে অজানা আতংক তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সন্ধায় পড়ালেখায় বসলে সীমান্তে অপরিচিতদের আনাগোনায় কষ্ট হলেও বইয়ে মনোযোগি হতে হয় তাকে।

বাবার সম্পদ বলতে শুধুমাত্র অল্প স্বল্প জমিতে কয়েকটি সুপারী গাছ। এগাছ গুলোর লালন পালন করতে হয় বাবা রনজিৎ কুমার রায় মা শেফালী রানী রায়সহ নিজে শিলা রানী রায়কে। ছোট ভাই দেবাশীষ রায় তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। ৭ সদস্যের সংসারে গৃহীনি মা ও স্বল্প আয়ের বাবাকে অসুস্থ দাদি এবং আরও পরিবারের দুইজন সদস্য নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। সন্ধা হলেই রাতের খাবারের চিন্তায় মগ্ন হতে হয় তাদের। জমিজমা নেইযে ঘরে চাল আছে। রান্না করে সবাই মিলে খাবেন। তার পরেও থেমে নেই শিলা রানী রায়ের পড়ালেখা। সে এবারের প্রকাশিত দিনাজপুর বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার গংগারহাট এম এ এস উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক শাখায় সর্বোচ্চ ১১৭৬ নম্বর নিয়ে গোল্ডেন প্লাস পেয়েছে। তার বিদ্যালয়ের ১৯ জনের মধ্যে সেএকমাত্র মানবিক শাখায় ওই বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেছেছে। এখন তার জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার লড়াই। ধার করা বই নিয়ে পড়ার টেবিলে রাত কাটে শিলার।

শিলা রানী: জানায়, বাবা-মা ও প্রতিবেশী মান্নান স্যারসহ তাকে অংক ইংরেজী পড়াতেন আজিজুল ও মিল্টন স্যার। তারাসহ বিদ্যালয়ের স্যারদের সহযোগিতায় এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। ওনারা আমাকে শিখিয়েছেন । আমি পরিশ্রমের ফল পেয়েছি। আমার স্বপ্ন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা।

মা শেফালী রানী রায় বলেন, আমাদের কোনো জায়গা-জমি নেই। সামান্য জমিতে ছোট্ট একটি ভাঙা কুড়ে ঘরই আমাদের ঠাঁই। শিলার পড়ালেখা চালিয়ে যেতে সমাজের বিত্তশীলদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

শাকিল মিয়া:

বাবার দিন মজুরীর আয়ে কোন রকমেই সংসার চলতো। শাকিল মিয়া সবার বড়। দিন মজুর বাবা ফারুক মিয়া সংসার চালাতে সব সময় হিমশিম খেতো। কোন রকমেই সংসারসহ ছেলের পড়াশুনা চালাতেন। শত অভাবের মাঝেও  ছেলের পড়াশুনা বন্ধ করেনি দরিদ্র বাবা ফারুক মিয়া। বাবার অভাবের সংসারে থেকে অনেক কষ্টে খেয়ে-পড়ে পিএসসিতে এ প্লাস পায়। সে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তার বাবার সংসার আরও নাজেহাল হয়ে পড়ে। তাই বাবার সংসারের করুণ পরিনিতি দেখে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াশুনার পাশাপাশি সে বালারহাট বাজারে হোটেলের শ্রমিকের কাজ করে। এভাবেই বিভিন্ন হোটেলে শ্রমিকের কাজের পাশাপাশি সে তার পড়ালেখাটা অনেক কষ্টে চালাতো। দিনে হোটেলে কাজ করতো। রাতে বাড়ীতে পড়াশুনা চালিয়ে যেতো। সর্বশেষ শাকিল ফুলবাড়ী সদরে একটি হোটেলে কাজ-কামাই করে বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। অভাবের তাড়নায় ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষা ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে বসেছে শাকিলের। তার বাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কুরুষাফেরুষা গ্রামে। সে ওই গ্রামের দিন মজুর ফারুক মিয়ার ছেলে।  ।

বাবা ফারুক জানান, আমরা ছেলে হোটেলে শ্রমিকের কাজ করে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে ছেলের পড়ালেখায় ছিলাম সচেতন। তাদের মাঝে বলতাম, আমাদের অভাব সংসার। নেই জমিজমা। হোটেলে শ্রমিকের কাজ করেই আমাদের চলতে হয়। ইচ্ছা থাকলে কি  শিক্ষা ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বাবা? আমাদের তো কিছুই নেই।

শিউলী রানী রায়:

জিপিএ-৫ পেয়ে অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা তা নিয়ে শংকা পড়েছে শিউলী রানী ও তার দরিদ্র পরিবার। উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পূর্বফুলমতি গ্রামে দিনমজুর গনেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে। গনেশ চন্দ্র রায়ের দুই ছেলে দুই মেয়ে। শিউলী সবার ছোট। বড় ছেলে মাষ্টাস পাশ করে চাকুরী না পেয়ে বাড়ীতে টিউশনি পড়ে সংসার চালান। দ্বিতীয় ছেলে বিএ পাশ করে ঢাকায় গার্মেসে চাকুরী করেন। অনেক কষ্টে দ্বিতীয় মেয়েকে বিয়ে দেন। টিউশনি পড়ে এবারে বালারহাট আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। অভাবের তাড়নায় ইচ্ছা থাকলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে বসেছে শিউলী রানী রায়।

শিউলী রানী জানায়, টিউশনির টাকা দিয়ে পড়ালেখার খরচ যোগার করেছি। শিক্ষক আর আত্মীয় স্বজনদের সহযোগিতায় এসেছি এতদূর। অর্থাভাব আর বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা হবার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকায় করছে শিউলী রানী। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে গরীব-দু:খী মানুষের সেবা করতে চান শিউলী রানী।

বাবা দিনমজুর গনেশ জানান, অভাবের সংসারে ৭ জন সদস্য। যে দিন কাজ জোটে সেদিন ভাল মন্দ মুখে ভাত উঠে। আর কাজ না জুটলে তিনবেলা খাবার থাকেনা। ধারদেনা করে কোন রকমে সংসার চলে। মা উর্মিলা রানীও মাঝে মধ্যে অন্যের বাড়ীতে কাজ করে। পড়ালেখার খরচ যোগাড় করতে আগামীতে কিভাবে ওর পড়াশুনা চলবে তা নিয়ে দুশ্চিতায় কাটছে পরিবারের সবার।

তাকিয়া আক্তার মনি:

বালারহাট আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ গোল্ডেন-৫ পেয়েছে তাকিয়া আক্তার মনি। মনি এর আগে পিএসসি ও জেএসেিত জিপিএ-৫ পেয়ে দরিদ্র কৃষক বাবার সুনাম অর্জনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও সুনাম অর্জন করেছে। মনি উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পূর্বফুলমতি  গ্রামের দিন দরিদ্র কৃষক আনিচুর রহমান ভোলার মেয়ে। আনিচুর রহমান দরিদ্র কৃষক মানুষের জমি লিজ নিয়ে কোন রকমেই চার সদস্যের সংসার চালার পাশাপাশি এক ছেলে ও এক মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাতেন। স্বল্প আয়ের দরিদ্র কৃষক আনিচুর রহমান ভোলা অভাবের সংসারে কিভাবে মেয়ের পড়ালেখার কাজ চালাবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। ফলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে চরম হতাশা ভুকছেন তিনি।   

তাকিয়া আক্তার মনি:জানান, আমার বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। আমাদের আবাদী জমি না থাকায় বাবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। কোন রকমেই চলছে আমাদের সংসার। গরীব বাবা-মা কিভাবে আমাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি করাবে ভেবেই পাচ্ছি না। তার উপর সামনের এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার সাধনা যেন তার পূর্ন হয় সে জন্য সকলের কাছে দোয় কামনা করেন। তাকিয়া আক্তার মনির স্বপ্ন সে ডাক্তার হয়ে সমাজের গরীব দু:খীদের পাশে দ্বাড়াতে চায়।

মনির বাবা আনিচুর রহমান ভোলা জানান, আমার মেয়েটা ডাক্তার হতে চায়। কোথায় ভর্তি হবে, টাকা কোথায় পাবো। বাড়িভিটা ছাড়া আর কিছুই নাই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কোন রকমেই সংসার চালাচ্ছি। ঘরে নেই জমানো টাকা পয়সা। ছোট ছেলেটি দশম শ্রেণীতে পড়ছে। সামনের দিনে ছেলে ও মেয়ের লেখা পড়ার খচর কি ভাবে মিটাবে ভেবেই পাচ্ছেন না তার পরিবার। এ নিয়ে নিঘুম পার করছে পরিবারের সবাই।

 

 

 

 

 

 

 

  

    

 

 

 

 

 

 

 

  

    

সর্বশেষ

জনপ্রিয়