১৪ ফাল্গুন, ১৪৩২ - ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ - 27 February, 2026

বদরগঞ্জে লাভের আশায় তামাক চাষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কৃষকরা

8 hours ago
37


লক্ষ্যমাত্রায় চেয়ে বেশি ৩৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ

মোস্তাফিজুর রহমান, বদরগঞ্জ রংপুর :

রংপুরের বদরগঞ্জে কৃষকেরা ভুট্টা, গম চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা ঝুঁকছেন তামাক চাষে। লাভ বেশি হাওয়ায় কৃষকেরা তামাক চাষ করছেন। এতে ভুট্টা ও গম চাষ কমলেও বেড়েছে তামাক চাষ। তবে তামাক কাটা ও শুকানোর কাজে শিশুদের ব্যবহার কড়ায় তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। শিশুরা হাঁপানি সহ ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তামাকজাত পণ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বীজ ও সারের টাকা আগাম সরবরাহ করায় বেড়েই চলেছে তামাকের চাষ। ফলে অল্প পুঁজি ব্যবহার করে অধিক লাভের আশায় তামাক চাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা। তামাক চাষের নির্দিষ্ট কোনো রাসায়নিক সার বরাদ্দ না থাকলেও ব্যাপক পরিমাণ সার ব্যবহার করা হচ্ছে।

তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে পরামর্শ। আইন না থাকায় তামাক চাষ বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে তামাক চাষের কুফল বিভিন্ন সভায় তুলে ধরে এ ফসল চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য ফসলের তুলনায় লাভবেশি হওয়ায় কৃষকেরা তামাক চাষে ঝুঁকছেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা গেছে, ২২ হাজার ১৯০ হেক্টর আবাদি জমি আছে এর মধ্যে ভুট্টা চাষের উপযোগী জমি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর, গম চাষের উপযোগী জমি প্রায় ৮৫ হেক্টর। সরিষা চাষের উপযোগী জমি প্রায় ৫ হাজার ৪৩০ হেক্টর ও জলাশয় রয়েছে ২২৫ হেক্টর জমি।

উপজেলা সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ বলেন, গত ২০২৪ সালে গম চাষ হয়েছিল ৮৫ হেক্টর জমিতে। ভুট্টা চাষ হয়েছিল ২ হাজার ৮৪৫ হেক্টর। গত বছরের তুলনায় এ বছর ৮৬ হেক্টর গম চাষ কমে ৮৫ হেক্টর জমিতে গম চাষ করা হয়েছে। তবে এবছর ভুট্টা ২ হাজার ৮৪৫ বেড়ে ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর ভুট্টা চাষ করা হয়েছে। উপজেলার ১৭০ হেক্টর জমি গম চাষের জন্য উপযোগী হলেও কৃষি বিভাগ প্রতিবছর গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা কম নির্ধারণ করছে। লক্ষ্যমাত্রা ক্রমে কম করার কারণ হিসেবে কৃষক ও কৃষি বিভাগ বলছে, শ্রমিকূসংকট, ভালো বীজের অভাব ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গম চাষে কৃষকেরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। গমের চেয়ে তামাক চাষে লাভ বেশি হাওয়ায় তাঁরা তামাক চাষে ঝুঁকছেন। এ কারণে দিন দিন তামাক চাষ বাড়ছে। গত বছর ২২ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। এ বছরে ৩৫ হেক্টর জমিতে গমের পরিবর্তে তামাক চাষ করে প্রতি হেক্টরে কৃষকেরা এক লাখ টাকা বেশি লাভ করছেন।

দামোদরপুর ইউনিয়নের কৃষক সাইদুল ইসলাম বলছেন, কোম্পানির লোক আগে বীজ, সার ও ওষুধের টাকা দেয়। জমিতে দাঁড়িয়ে থেকে কোম্পানির লোক তামাক উঠিয়ে দেয়। আমরা শুধু তামাক নাগাই আর কাটি।তামাক চাষে কোনো লোকসান নাই। দ্বিগুন লাভ হয়।

মধুপুর ইউনিয়নের আফানের পাড়া গ্রামের কৃষক রশিদ মিয়া বলেন, তামাক চাষ না করে কি করব। তামাক উঠিয়ে ধান গারবো। এ বছরে ভুট্টা চাষ করিনি। কারণ ভুট্টা চাষ করলে ধান চাষ করা যায় না। তামাক উঠিয়ে ধান লাগালে ধানের ফলন ভালো হয়।। গমের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের এই এলাকায় খুব কম গম চাষ করছে। গমে লাভ কম হয়। তামাকে লাভ বেশি হয়। এজন্য সবাই তামাক চাষ করছি। বর্তমান সময়ে অন্যান্য ফসলে লাভপাইনা। প্রতি বছরে লস হয়। গম কাটার সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। আর তামাক চাষ করলে শ্রমিকের সমস্যা হয় না। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে চাষ করা যায়। এবছর ২৪ শতক জমির তামাক চাষ করছি। ভালোভাবে তামাক শুকানোর পর বিক্রি করে লাভ হবে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতন। এই জন্যে তামাক আবাদ করেছি।

চ্যাংমারি এলাকার কৃষক খায়রুল হক বলেন, প্রতিবছর আমি গম ও ভুট্টা চাষ করি। তেমন একটা লাভ হয় না। এ বছরে তামাক চাষ করেছি। গমের চেয়ে পরিশ্রম কম লাভ বেশি হবে। তিনি আরও বলেন, কোম্পানির লোকজন জমিতে দাঁড়িয়ে থেকে তামাক আবাদ করা দেখিয়ে দেয়। তামাক শুকানোর পর বেশি দাম দিয়ে কিনে নিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা তামাক চাষে কোন ঝুঁকি নাই। এজন্য এবছর তামাক আবাদ করেছি।

গোপালপুর ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের কৃষক মিলন চন্দ্র বলেন, প্রতিবছর গম ও ভুট্টা চাষ করেন। কিন্তু এবার ভালো গম বীজ না পাওয়ায় জমিতে গম চাষ করেননি। তবে বিনা মূল্যে তামাকের বীজ পাওয়া এবং মুনাফা বেশি হওয়ার আশায় ৪৫ শতক জমিতে তামাক চাষ করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ জানান, তামাক জাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কু ষকদের বিনা মূল্যে তামাকের বীজ দেন। এ এছাড়াও সার দেন, অনেক সময় ঋণও দেন। বিনা পুঁজিতে লাভ বেশি পাওয়ায় কৃষকেরা তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এ কারণে উপজেলায় গম চাষ কম করেছে কৃষকরা। তবে ভুট্টা গত বছর তুলনায় এবছর কিছুটা বেড়েছে।

বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আশিকুল আরেফিন বলেন, তামাক চাষে লাভ বেশি হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে, পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। মানুষও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের তামাক কাটা ও শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হলে তাদের হাঁপানি ও ফুসফুসে ক্যানসারের মতো জটিল রোগ হতে পারে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth