৪ আষাঢ়, ১৪৩১ - ১৯ জুন, ২০২৪ - 19 June, 2024
amader protidin

৩০ বছর ধরে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন সৌদি ফেরত আনোয়ার

আমাদের প্রতিদিন
1 year ago
610


নিজস্ব প্রতিবেদক:

নব্বই দশকে হেফজ পড়াশুনা শেষ করার পর রংপুরে কয়েকটি মসজিদে তারাবিতে ইমামতি করেছিলেন আনোরুয়াল ইসলাম সাজু। পরে ১৯৯২ সালে চাকরির সুবাদে তিনি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের সোলেমানিয়াতে চলে যান। সেখানে এক বছর পর মাহে রমজানে একটি ওয়াক্তি মসজিদে দীর্ঘ সাত বছর তারাবির ইমামতি করেন।

সৌদির প্রবাস জীবনে মসজিদে মসজিদে গিয়ে রমজানে মাসে ভিন্নরকম প্রশান্তি পেয়েছেন এই হাফেজ। সেখানকার হাফেজে কুরআনদের মন জুড়ানো তেলোয়াত আর রমজানের ইবাদত ভুলতে পারেননি এখনো।

রমজানকে ঘিরে আলাপচারিতায় সেই কথাগুলোই বলছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম সাজু। সৌদি থেকে দেশে ফেরার পর রংপুরের বেশ কয়েকটি মসজিদে বিভিন্ন রমজানে তারাবির ইমামতি করেছেন। এখন রংপুর মহানগরীর শাপলা চত্বও হাজীপাড়া এলাকার আশরাফিয়া জামে মসজিদে তারাবির নামাজে ইমামতি করছেন তিনি।

ত্রিশ বছর ধরে তারাবিতে ইমামতি করানো হাফেজ আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, জীবনের শ্রেষ্ঠ তারাবির সময় কেটেছে সৌদি আরবে। সেখানকার মানুষরা রমজান মাসে রাতদিন ইবাদত বন্দেগিতে ব্যস্ত থাকে। বিশেষ করে সালাতুল তারাবি থেকে তাহাজ্জুতের সময় পর্যন্ত চারদিক থেকে ভেসে আসা সুমধুর কুরআন তেলোয়াত বিমোহিত করার মত।

তিনি আরও বলেন, মাহে রমজান এলেই মন চায় সৌদি আরব যেতে। কুরআনের উচ্চারণ, ইয়াদ, সুর যেন বারবার এই আকুতি জানায়। পবিত্র রমজান জুড়ে ইসলামের পূণ্যভূমি সৌদি আরবে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকে সেখানকার মানুষরা। ইবাদতের বালাখানায় ইফতার, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, সেহরি আর কুরআন তেলোয়াতে নেই কোন ঘাটতি।

এ মাসে সম্প্রীতির বন্ধন, একে অপরের খোঁজখবর আর অসহায়ের পাশে দাঁড়াবার জন্য উদগ্রীব থাকে সৌদির মানুষরা। এমন প্রশান্তির পরিবেশে দীর্ঘ সাড়ে আট বছর সময় কেটেছে আনোয়ারুল ইসলাম সাজুর। তাই রমজান মাস এলেই সৌদি আরবে ফিরে যেতে চান তিনি। রমজান জুড়ে সৌদি আরবে ইফতার সামগ্রী ক্রয় নিয়ে কাউকে চিন্তা করতে হয় না। সেখানকার ধর্নাঢ্যরা ইফতারের পরসা নিয়ে বসে থাকেন রোজাদারদের অপেক্ষায়, যোগ করেন তিনি।

আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সৌদিতে ইফতারের সময় মসজিদে মসজিদে হাজার হাজার রোজদার এক সাথে ইফতার করে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরাও রোজাদারকে ডেকে নিয়ে ইফতার খাওয়ান। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্তসহ অসহায়, গরীবদের সেখানে ইফতার কিনে খেতে হয় না। কোন না কোন মাধ্যমে তারা ইফতার পেয়ে যান। শুধু সেহরির সময়টুকো বাদ দিয়ে পুরো সৌদি আরবের মসজিদে মসজিদে ইফতার, তারাবি ও তাহাজ্জুদের সময় মুসল্লিদের ঢল নামে।

এই কোরআনের হাফেজ বলেন, মুসলমানদের জন্য সারা বছরই নামাজ ফরজ। তাই রমজানের সবচেয়ে উত্তম ইবাদত হচ্ছে কুরআন তেলোয়াত। রোজার সাথে কুরআন তেলোয়াত মনকে শীতল রাখে। সৌদিতে তারাবির সময় কুরআনের আয়াত শুনে মুসল্লিদের কেউ কেউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কিন্তু আমরা কুরআনের তেলোয়াত শুনি, অর্থ বুঝি না। একারণে আমাদের মধ্যে কুরআন শোনার মনযোগ কম। সৌদির মসজিদগুলোতে শুধু বিশ রাকাত সালাতুল তারাবিতেই নয়, তাহাজ্জুদের সময়ও মুসল্লিরা দীর্ঘ সময় নামাজ আদায় করেন। অথচ বাংলাদেশে আমরা নামাজের ব্যাপারে উদাসীন। আট রাকাত নামাজ পড়ে বেশির ভাগ মুসল্লি চলে যায়।

এই রমজানে অসহায়, গরীব, মিসকিনদের বেশি বেশি সাহায্য সহযোগিতা ও দান করার তাগিদ দিয়ে এই হাফেজ বলেন, আমি পনের দিন তারাবির ইমামতি করতাম। আর পনের দিন মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন মসজিদে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তাম। কখনোই মসজিদে মুসল্লি কত দেখিনি। কিন্তু আমাদের দেশেতো রমজানের প্রথম দশদিন পর থেকে মুসল্লি কমতে থাকে।

তিনি আরও বলেন, আল্লাহ্ যে উদ্দেশ্যে রমজানকে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস হিসেবে মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করেছেন, আমরা যদি তা সত্যিকার অর্থে তা অনুধাবন করতে পারি, তবেই স্বার্থক হবে নেয়ামত ও ফজিলতের এই মাসের ইবাদত।

আশরাফিয়া জামে মসজিদের মুসল্লি আব্দুর রহমান বলেন, আমি সৌদি আরবে গিয়েছিলাম। সেখান হজ করার সময়ে বেশ কিছু মসজিদে নামাজ আদায় করেছি। সৌদির হাফেজদের মতো আমাদের মসজিদেও তারাবির নামাজ পড়ান আনোয়ার হুজুর। তার কোরআন তেলোয়াত শুনলে মন জুড়ে যায়।

মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুল লতিফ খান বলেন, হাফেজ আনোয়ার দীর্ঘ বছর ধরে আমাদের মসজিদে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন। এর আগে শহরের বিভিন্ন মসজিদেও ইমামতি করেছেন। আমরা তার কোরআন তেলোয়াতে মুগ্ধ। 

বর্তমানে হাফেজ আনোয়ারুল ইসলাম সাজু রংপুর নগরীর নূরপূর এলাকায় উদ্দীন হাফিজিয়া মাদ্রাসাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি আশরাফিয়া জামে মসজিদে ইমামতি করছেন। তিনি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছি ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ি জুম্মারহাট গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন মিয়ার বড় ছেলে। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তিনি রংপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়