১২ ফাল্গুন, ১৪৩২ - ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ - 25 February, 2026

তিস্তা নদীতে বোমা মেশিনের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন ? তথ্য সংগ্রহকালে সাংবাদিকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা !

9 hours ago
20


ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:

নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদীতে বোমা মেশিন দিয়ে অবৈধ ভাবে পাথর উত্তোলনের তথ্য সংগ্রহকালে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন ডিমলা উপজেলার দুই সাংবাদিক। তথ্য সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি ও অনিয়ম আড়াল করতেই পরিকল্পিত ভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন ডিমলা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক বাদশা প্রামানিক (৫০) ও  সাংবাদিক নুর মোহাম্মদ (৩৫) । হামলাকারীরা তাদের ক্যামেরা ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোন মামলা দায়ের হয়নি।

ঘটনাটি ঘটেছে গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তিস্তা নদীতে বোমা মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে দুর্বৃত্তরা সাংবাদিক বাদশা প্রামানিক ও তার সঙ্গীয় সাংবাদিক সুমন এর উপর উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায়  অতর্কিত হামলা চালায়। স্থানীয়রা আহত দুই সাংবাদিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিন ধরে ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীর অভ্যন্তরে আব্দুল করিম সহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র সরকারি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে তিস্তা নদীর বুকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার পাশাপাশি সম্প্রতি নদীর তলদেশে বসানো হয়েছে একাধিক শক্তিশালী ‘সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন। প্রকাশ্য দিবালোকে এসব যন্ত্রের মাধ্যমে গভীর খাদ সৃষ্টি করে পাথর উত্তোলন করে আসছিল। এঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকরা বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় সংবাদ প্রচার করে। প্রশাসন একের পর এক যৌথ অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও জব্দ কার্যক্রম চললেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দমাতে পারেনি  এই সিন্ডিকেট।  তাই তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন: ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

পরবর্তীকে সাংবাদিকরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে  সরেজমিনে তথ্যচিত্র ধারণ করতে গেলে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকারবাসী মো, মতিয়ার রহমানের ছেলে অভিযুক্ত আঃ করিম (৪০) ও তার সহযোগী একই গ্রামের ডাবলু মাস্টার এর ছেলে তানজিরুল ইসলাম তুহিন (২৫) ক্ষিপ্ত হয়ে সাংবাদিকদের অশ্লীল গালিগালাজ করে একপর্যায়ে তাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালায় এবং ব্যবহৃত ক্যামেরা ও দুটি টাচ মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ বিষয় টেপা খড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন জানান, ঘটনার সময় আমি ইউপি কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলাম না। ঘটনা জানার পর পরিষদে গিয়ে কাউকে পাইনি তবে, পরিষদের সিসি ক্যামেরা দেখে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেছে।

ঘটনার পর উপজেলাজুড়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাংবাদিক নেতারা বলেন, সত্য উদঘাটনের পথে এ ধরনের হামলা কেবল একজন সংবাদকর্মীর ওপর আঘাত নয়; এটি মুক্ত সাংবাদিকতা, তথ্যের স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থের বিরুদ্ধে সরাসরি সহিংসতা। তারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

ডিমলার বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, হামলাকারীরা এভাবে সাংবাদিকদের নির্যাতন করে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করবে, সাংবাদিক নির্যাতনে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আরও বাড়বে এবং সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তা নদীর চরজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বোমা মেশিনের মাধ্যমে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে আসছে। এতে একদিকে যেমন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে  নদীভাঙনে দেখা দিচ্ছে  পরিবেশের উপর মারাত্মক ঝুঁকি  । সেই সাথে নদীতীরবর্তী  এলাকার কৃষকরা হারাচ্ছে তাদের কৃষিজমি, বসতি ।  স্থানীয়দের মতে  অনিয়ন্ত্রিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে ভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। গত কয়েকমাস ধরে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকা, তেলির বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর ও সুপুরিরটারীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ১৫ টির বেশি বোমা মেশিন দিয়ে প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন চলছে। নদীর তলদেশে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ায় উপজেলার ১০ ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন সহ আবাদি জমি, বসতভিটা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশুসম্ভাবনা রহিয়াছে।  অন্যদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর ডালিয়া শাখা নদীর ডানতীর সংরক্ষণে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে পাউবো। সম্প্রতি সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধ কাজও হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নদীর ভেতরে অবাধে পাথর উত্তোলন চলায় সরকারি প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, রাতের আঁধারে বোমা মেশিন বসিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এটি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, সাংবাদিকের ওপর বর্বর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয় । জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিস্তা নদীতে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে এবং এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না।

ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার বলেন, ঘটনার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া মাত্র আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়েরুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদীতে বোমা মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে যৌথ অভিযান পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া নদী থেকে পাথর বা বালু উত্তোলন দণ্ডনীয় অপরাধ। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী অবৈধ উত্তোলনের ক্ষেত্রে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জব্দ করার বিধান রয়েছে। বিস্ফোরকচালিত যন্ত্র বা বোমা মেশিন ব্যবহার জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী এ ধরনের কার্যক্রম পরিবেশগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত নদী ও পরিবেশ সুরক্ষায় অবৈধ খননের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে অবৈধ পাথর উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন বৃদ্ধি, পানি প্রবাহের পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এসব অনিয়ম বন্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া পরিস্থিতির গভীর সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

তিস্তা পাড়ের মানুষের দাবি, অবিলম্বে বোমা মেশিন উচ্ছেদ, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং স্থায়ীভাবে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় নদীভাঙন ও পরিবেশ বিপর্যয়ে তিস্তাপাড়ের হাজারো মানুষ চরম ক্ষতির মুখে পড়বে। আহত সাংবাদিক বাদশা প্রামাণিকের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth