১০ ফাল্গুন, ১৪৩২ - ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ - 23 February, 2026

তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন: ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ

9 hours ago
12


ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:

তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ -এমন অভিযোগে সরব স্থানীয়রা। একের পর এক যৌথ অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও জব্দ কার্যক্রম চললেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামছে না। ফলে প্রশ্নের মুখে পড়েছে রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিয়ে।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় তিস্তা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর, কালীগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়ি এলাকায় দিনের পর দিন চলছে বোমা মেশিন দিয়ে অবাধে পাথর উত্তোলন। বিভিন্ন পয়েন্টে বোমা মেশিন’ বসিয়ে তিস্তা নদীর তলদেশে গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে।

উপজেলা প্রশাসনের একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পাথর জব্দ করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রওশন কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত এসব অভিযানে বিজিবি, ডিমলা থানা পুলিশ ও আনসার ভিডিপি সদস্যরা অংশ নেন। তবে এলাকাবাসীর দাবি অভিযান শেষ হলেই আবার শুরু হয় পুরোদমে সিন্ডিকেটেদের পাথর উত্তোলন। তাদের মতে, প্রশাসনিক পদক্ষেপ সিন্ডিকেটের কাছে তেমন কোনো বাধা নয়; বরং অভিযান যেন লোক‘দেখানো ব্যবস্থায় থেকে যাচ্ছে।

সিন্ডিকেটরা অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর ডালিয়া পাউবো নদীভাঙন রোধে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। সম্প্রতি খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোট খাতা সুপরিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হয়েছে। গত বর্ষা মৌসুমে ডিমলা উপজেলার ১০ ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টিতে মারাত্মক ভাঙন হয়। বহু পরিবার ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। অথচ একই নদী থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন চলমান রয়েছে।

অভিজ্ঞ মহলের অভিযোগ, তিস্তা নদী রক্ষায় প্রধান দায়িত্বে থাকা ডালিয়া পাউবো কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায়। এমনকি সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর স্তূপ করে রাখার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এতে তিস্তা ব্যারেজ ও বৃহত্তর সেচ প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সেলিম আল দীন অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও স্থানীয়দের মতে ঘোষণা বাস্তবে দৃশ্যমান নয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেছেন, অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিজিবি অধিনায়কও জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিজিবি সচেষ্ট এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। স্থানীয়দের ভাষায়, তিস্তা নদী এখনো অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের জন্য একপ্রকার ‘স্বর্গরাজ্য’। দ্রুত, ধারাবাহিক ও সমন্বিত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রতিবছর সরকারের কোটি কোটি টাকার নদী রক্ষা প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

সচেতন মহলের অভিমত, আবার এমন যেন না হয় যে, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ একটি চক্রের প্রতি মৌসুমে বাধ নির্মাণ সহ সংস্কারের নামে শতশত কোটি টাকা আত্নসাতের কর্মযজ্ঞ ক্ষেত্রে পরিণত না হয়। এখন প্রশ্ন জিরো টলারেন্স কি মুখে মুখে, নাকি সত্যিই তিস্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়

// Set maxWidth